Global Header Bottom
আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

পর্ব- ৪

আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন বা কেন আমরা করতে পারিনি এ প্রসঙ্গে গত তিনটি সংখ্যায় কিছুটা আলোকপাত করেছি। এ প্রসঙ্গে আজকে আরও কয়েকটি দিক তুলে ধরতে চাই। আমাদের প্রথমেই মনে রাখতে হবে লোকাল মার্কেট এবং গ্লোবাল মার্কেট এক বিষয় নয়। লোকাল মার্কেটের কাস্টমার, মার্কেট সাইজ, মার্কেট ডিমান্ড, মার্কেটের কম্পিটিশন সবই ভিন্ন। আমরা যদি কোনো ফুড আইটেম নিয়ে চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে লোকাল মার্কেটের টেস্ট এবং গ্লোবাল মার্কেটের টেস্ট এক নয়। আমরা যখন গ্লোবাল ব্র্যান্ড নিয়ে চিন্তা করব তখন আমাদের অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে গ্লোবাল মার্কেটের টেস্ট কেমন। আমি যদি লোকাল মার্কেটের অবিকল পণ্য নিয়ে গ্লোবাল মার্কেটে প্রতিযোগিতা করার স্বপ্ন দেখি তাহলে সেটা কখনো বাস্তবায়নযোগ্য হবে না।

প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের খাদ্যের একটি নিজস্ব রেসিপি রয়েছে। আমি যদি সেই রেসিপি অনুসরণ করতে না পারি তাহলে আমার পক্ষে ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করা সম্ভব হবে না। বিষয়টি যদি উদাহরণ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করি তাহলে এভাবে বলা যায় ঢাকার মানুষ রান্নার মধ্যে যে পরিমাণ মসলা এবং যে ধরনের মসলা ব্যবহার করেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর ভিন্নতা রয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের কালাভুনা ওই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ খাবার। ওই খাবারই হয়তো বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত নাও হতে পারে। আমার অঞ্চলের কোনো একটি পণ্য আরেকটি অঞ্চলের ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দে গ্রহণ করবে এমনটি মনে করার কোনো সুযোগ নেই।

আমি আগেও উল্লেখ করেছি আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো বিদেশে পণ্য পাঠানোর সময় বিবেচনা করে ওই দেশে আমার দেশের তথা বাংলাদেশের কত লোক বসবাস করছে। কারণ কোম্পানিগুলো খুব ভালোভাবেই জানে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে থাকতে দেশকে যতটুকু ভালোবাসে বিদেশে যাওয়ার পর দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং মনে রাখা দুটোই অনেক বেড়ে যায়। এ কারণে প্রবাসীরা যখন দেশের কোনো পণ্য পায়, দেশের মানুষকে কাছে পায় তখন তাঁদের মধ্যে অনেক বেশি উচ্ছাস দেখা যায়। এই উচ্ছাসের কারণে আমাদের প্রবাসীরা এদেশের পণ্যগুলো বেছে নেয়। কিন্তু আমরা যদি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্বের নানা প্রান্তে আমাদের কোনো পণ্য ছড়িয়ে দিতে চাই তাহলে আমাদের অবশ্যই ফুড টেস্ট গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড হতে হবে। আমরা মুখে বলব কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটবে না তাহলে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি করা সম্ভব নয়। ফুড আইটেমের ক্ষেত্রে “প্রমিজ অব দ্য টেস্ট” ধারণাটিকে আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের এই প্রমিজ এর প্রতি সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আমরা যদি আমাদের দেশের ফ্যাশন হাউজগুলোর কথা বিবেচনা করি তাহলে সেখানেও দেখা যাবে গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলোর সাথে আমাদের বিস্তর পার্থক্য। দুবাই শপিংমলগুলোতে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের প্রতিটি শোরুম আমাদের দেশের ব্র্যান্ডগুলোর শোরুম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ভিন্নতা মার্কেটারকে বুঝতে হবে। শোরুমের সাইজ, প্রোডাক্ট ডিসপ্লের ধরন, প্রযুক্তির ব্যবহার, সেলসম্যানদের যোগ্যতা, ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন সবই গ্লোবাল বিষয়টিকে বিবেচনা করে করা হয়েছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের যে শোরুমগুলো রয়েছে সেগুলোর সাথে দুবাইয়ের শোরুমগুলোর কোনো মিল নেই। আমাদের দেশের পণ্যগুলোর প্যাকেজিংয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্যাকেজিং উন্নত হয়েছে। কিন্তু গ্লোবাল ব্র্যান্ড হওয়ার মতো সেটা হয়েছে কিনা তাও আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে। গ্লোবাল ব্র্যান্ড হতে হলে কমপ্লায়েন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এক্ষেত্রেও আমাদের অনেক কাজ করার অবকাশ রয়েছে। গ্লোবাল ব্র্যান্ড হতে হলে “আর অ্যান্ড ডি” এর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের কোম্পানিগুলো বিশে^র অন্যান্য গ্লোবাল ব্র্যান্ডের তুলনায় তলানিতে অবস্থান করছে।

ব্র্যান্ডের একটি বা দুটি জায়গায় কাজ করলে গ্লোবাল ব্র্যান্ড হয় না। গ্লোবাল ব্র্যান্ড হতে হলে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করতে হবে। আংশিক চিন্তা করে বা আংশিক কাজ করে কখনো গ্লোবাল ব্র্যান্ড হওয়া যায় না। গ্লোবাল ব্র্যান্ডের জন্য গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কমিউনিকেশন লাগবে। প্রশ্ন হলো এ ধরনের কমিউনিকেশন করার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী আমাদের কতজন আছে। আমাদের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড সিএফও লাগবে। সিএফও-ই বা কতজন আছে। গ্লোবাল ব্র্যান্ড হতে হলে মানবসম্পদ বিভাগকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড হতে হবে, অন্যথায় এই বিভাগ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কর্মী নিয়োগ করতে পারবেনা। আমাদের সেলস, মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, সাপ্লাই চেইন প্রতিটি জায়গায় গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কর্মী নিয়োগ করতে হবে। কিন্তু আমরা যখন চারপাশে তাকিয়ে দেখি তখন দেখা যায় এগুলোর তীব্র অভাব। তাহলে আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড কি করে হবে। বিশে^র যে সকল কোম্পানির গ্লোবাল ব্র্যান্ড রয়েছে ওই সকল কোম্পানির কাজের সাথে আমাদের লোকাল কোম্পানির কাজে কোনো মিল নেই। এত অমিল নিয়ে আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড কিভাবে তৈরি হবে। সর্বোপরি আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের নয়। এই শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে গ্লোবাল মার্কেটে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা আদৌ সম্ভব কিনা সেটাও বিবেচনার দাবী রাখে।

মার্কেটিং কনসালট্যান্ট

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer