পণ্যের সাথে অনুষঙ্গ: কেমন হওয়া প্রয়োজন
অনেকে মনে করেন পণ্যের সাথে সেলেবিট্রির সংযুক্তি অপরিহার্য। তাঁদের ধারণা এতে পণ্যের প্রচার সহজ হয়। ফলে পণ্য বিক্রির পরিমাণ সহজেই বাড়ানো যায়। অথচ তাঁরা এটা মরে রাখেন না, কাস্টমারের সাবকনসাস মাইন্ড সব সময় রিয়েলিস্টিক মেসেজ খুঁজে বেড়ায়। তাঁরা এটাও গভীরভাবে চিন্তা করেন না একজন সেলেব্রিটি পণ্য প্রচারের সাথে যুক্ত হলে এর অন্তর্নিহিত ফলাফল কি হতে পারে। একটি পণ্য যখন বাজারে আসে তখন তো ওই পণ্যটি নতুন থাকে। অন্যদিকে একজন সেলেব্রিটির ব্র্যান্ডভ্যালু অনেক ওপরে থাকে। ফলে তাঁকে সকলে এক নামেই চিনে। এ ধরনের একজনকে দিয়ে যখন কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয় তখন পণ্যটি ‘ওভার শ্যাডো’ হয়ে যায়। ফলে প্রোডাক্টটি আর হাইলাইট হয় না। মানুষের মনোযোগ তখন সেলেব্রিটির দিকে থাকে, পণ্যের দিকে নয়। এটা তো গেল একটি দিক। আরেকটি দিকের অবস্থা আরও ভয়াবহ।
লক্ষ্য করুন পণ্যটি নতুন। অথচ পণ্যের মডেল বলছেন, তিনি এটি নিয়মিত ব্যবহার করছেন বা খাচ্ছেন বা তাঁর পছন্দের শীর্ষে। যে পণ্যটি বাজারে সবেমাত্র এসেছে ওই পণ্য তিনি কি করে নিয়মিত ব্যবহার বা ভোগ করছেন। মার্কেটিং মানে কোনো গলাবাজি নয়। কোনো মিথ্যাচারও নয়। সত্যিকার মার্কেটিং সব সময় অথেনটিক বিষয়টিকে সর্বাগ্রে বিবেচনার চেষ্টা করে। এই জায়গাটিতে কেন জানি আমরা ‘বিক্রি করতে পারলেই বাঁচি’ এমন একটি অবস্থা তৈরি করে ফেলি। আমরা মনে করি ওই হিরো বা হিরোইনকে দিয়ে বিজ্ঞাপন করাতে পারলেই আমার পণ্য হু হু করে বাজারে চাহিদা তৈরি করতে সক্ষম হবে। পণ্য বিক্রি বেড়ে যাবে। আসলে তা হয় না। বরং কোম্পানির টাকায় ওই সেলেব্রিটির ব্র্যান্ড ভ্যালু আমরা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছি। আর ব্র্যান্ডের সাথে কাস্টমারের একটি মিস কমিউনিকেশন তৈরি করছি।
আমরা সব সময় বলি ‘প্রোডাক্ট ইজ মাই হিরো’। এ কারণে আমার পণ্যকে ঘিরে আমি প্রটেকশন তৈরি করব। পণ্যকে প্রটেকশন দেব। আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী যখন রাস্তা দিয়ে যান তখন তাঁদের চলাফেরার জন্য প্রটেকশন দেওয়া হয়। কোনো হিরো যখন রাস্তায় চলাফেরা করেন তখন তাঁর সাথে অন্যরা একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করেন। হিরোর সাথে যেন কারও ধাক্কা না লাগে সে বিষয়টি সকলে খেয়াল করেন। একইভাবে আমার প্রোডাক্টকেও গুরুত্বের সাথে ফোকাশ করতে হবে। গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দিলে চলবে না। মনে রাখতে হবে মার্কেটিং কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে সবই হচ্ছে অনুষঙ্গ।
আর প্রোডাক্ট হচ্ছে হিরো। অতএব প্রোডাক্টকে হাইলাইট করতে হবে। প্রোডাক্টের কোর বেনিফিটকে হাইলাইট করতে হবে, অন্যকিছুকে নয়। বিয়ে বাড়িতে কনের পাশে যদি একজন সুন্দরী, স্টাইলিস মেয়ে বসে থাকেন তাহলে অনুষ্ঠানে আগত মেহমানদের দৃষ্টি বারবার নড়াচড়া করবে। অপ্রিয় হলেও সত্য, আমরা আমাদের পণ্যের ক্ষেত্রে বারবার এ ধরনের ভুলগুলোই করে থাকি। এই ভুলগুলো থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই প্রয়োজন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং। এ কাজটি সবার পক্ষে নিখুঁতভাবে করা সম্ভব না। কারণ, আমরা সব সময়ই বলি ‘মার্কেটিং ইজ নট অ্যা গ্রাসরুট ডেমোক্রেসি’। আমাদের এখানে যেটা হয় তা হলো ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’। অর্থাৎ একজন এভাবে বানিয়েছে। অত্রএব আমাকেও ওই একইভাবে বানাতে হবে।
একটি কোম্পানি হয়তো অনেক বছর চেষ্টা করে একটি পণ্যের ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করেছে। আরেকটি কোম্পানি যখন কোনোভাবেই ওই পণ্যের বাজার অংশে ভাগ বসাতে পারছে না তখন ওই পণ্যের প্যাকেটের মতো করে হুবহু প্যাকেটে পণ্য মার্কেটিং করছে। উদ্দেশ্য হলো ক্রেতারা যেন ভুল করে নকলকারী মার্কেটারের পণ্য কিনে নেয়। এটা কোনো মার্কেটিং পলিসির মধ্যে পড়ে না। মার্কেটিংয়ের সাথে ক্রিয়েটিভ, ইনোভেটিভ ও কমিউনিকেটিভ নিবিঢ়ভাবে জড়িত। ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ মার্কেটিং দ্বারা প্রকারন্তরে প্রতিযোগি ব্র্যান্ডকেই প্রমোট করা হয়। কারণ ক্রেতা যখন নকলকারী ব্র্যান্ডের পণ্যটি দেখবে তখনই তাঁর মনে পড়বে এটি ওই পণ্যের প্যাকেট নকল করে বানিয়েছে।
এভাবে বারবার ক্রেতাকে প্রতিযোগি ব্র্যান্ডের পণ্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়। আমি নিজেকে একজন ফলোয়ার হিসেবে প্রমাণ করছি। পাশাপাশি ওই ব্র্যান্ডটিকে মার্কেট লিডারের জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো এক ধরনের ‘হাইব্রিড ম্যানেজার’ তৈরি করছে যাঁরা কখনো কোম্পানিকে লিডার বানানোর স্বপ্ন দেখাতে পারে না। এই ম্যানেজাররা সব সময় নকল নিয়ে চিন্তা করেন। কোনো নতুনত্ব নিয়ে চিন্তা করেন না। একজন যোগ্য ম্যানেজার কখনো লিডারকে অন্ধের মতো ফলো করবে না। বরং লিডারের স্ট্যান্ডার্ডের বেঞ্চমার্ক কি তা নিয়ে চিন্তা করবে। কিভাবে লিডারকে ছাড়িয়ে যাওয়া যায় তা নিয়ে চিন্তা করবে।
আফতাব মাহমুদ খুরশিদ কর্পোরেট জগতে অতি পরিচিত নাম| অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ব্র্যান্ড ক্যাটালিস্ট হিসেবে| ২০০৭ সালে তিনি পেয়েছেন ব্র্যান্ড লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্ট থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন| অতপর যুক্তরাজ্য থেকে মার্কেটিংয়ে এমবিএ| দেশের বিভিন্ন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বহুজাতিক কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর| স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিমেন্স, এসিআই, বাংলালায়ন, রেডিও টুডে, প্রাইড, ট্রাস্ট ব্যাংক, বেঙ্গল গ্রুপ, অ্যাপোলো হাসপাতাল, এসএসজি, সিটি ব্যাংকসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন| এছাড়া দেশে-বিদেশে ব্র্যান্ড সম্পর্কিত বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদান করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন|