নেতৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের সাফল্য
লিডারশিপ বা নেতৃত্বের কোনো বিকল্প হয় না। যুগ যুগ ধরে এই সত্যই বারবার প্রমাণিত হয়ে আসছে। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা বা বিশ^কে নেতৃত্ব দেওয়া সব জায়গাই এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা হরহামেশা বিভিন্ন কারণে “করপোরেট লিডার” শব্দযুগল ব্যবহার করছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের নেপথ্যে করপোরেট লিডারদের ভূমিকাই মূখ্য। তাঁদের নেতৃত্বই প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিচ্ছে। লিডারশিপ একটি প্রতিষ্ঠানের কাজের ধারা বদলে দেয়। কর্মীদের যারপরনাই কাজের প্রতি উৎসাহিত করে তোলে। লিডারশিপ স্বল্প সময়ে, স্বল্প ব্যয়ে, স্বল্প শ্রমে অধিক কাজের নিশ্চয়তা দেয়। কর্মপরিবেশ উন্নত করে। কাজের গুণগতমান বাড়িয়ে দেয়। কর্মীদের মনে সন্তুষ্টি বাড়িয়ে দেয়। আর এ সবই প্রতিষ্ঠানের জন্য সুফল বয়ে আনে। যার শেষ ফলাফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠান মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ পায়।
আমি মূলত লন্ডনের একটি মার্কেটিং কোম্পানিতে কাজ করছি। এই কোম্পানি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং প্রমোশনের কাজগুলো করে। আমাদের প্রচুর মার্কেটিং প্রমোশন ক্যাম্পেইনের কাজ করতে হয়। কাজগুলো এতোটাই নিখুঁতভাবে করা হয় যেটা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পেইনের লক্ষ্য পূরণে দারুণভাবে সহায়তা করে। প্রতিটি কাজের সফল পরিসমাপ্তির কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন আমাদের সিস্টেমের কারণে কাজগুলো আমরা সুন্দরভাবে করতে পারছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো সিস্টেমটি এলো কোথা থেকে? এখানেই উত্তর হলো ওই লিডারশিপ থেকে। লিডারশিপই বলে দেয় প্রতিষ্ঠান কিভাবে চলবে। আর ওই লিডারশিপ থেকেই বেরিয়ে আসে প্রতিষ্ঠান দিনশেষে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে।
ইংল্যান্ডে অসংখ্য ছেলেমেয়ে পার্টটাইম জব করে। এটা শুধু ইংল্যান্ডে নয়। বরং পুরো পৃথিবী জুড়েই এই দৃশ্য বিদ্যমান। অনেক ছেলেমেয়ে পার্টটাইম জব হিসেবে বিভিন্ন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি বা মার্কেটিং কোম্পানিতে কাজ করছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানেও অনেক ছেলেমেয়ে কাজ করছে। এদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। আজ আমি পাঠকদের আমাদের কোম্পানির একটি মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের কাজের ধরন সম্পর্কে জানাবো। এটা জেনে হয়তো কারও কারও কাছে কাজের এই ধরনটি ভালো লাগতেও পারে। কেউ কেউ হয়তো এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসার কথা চিন্তাও করতে পারেন।
মনে করুন আগামীকাল ক্যাম্পেইন শুরু হবে। কোনো ব্যাংকের একটি নতুন প্রোডাক্ট নিয়ে ক্যাম্পেইন। লন্ডন শহরের ১০০টি পয়েন্টে এই ক্যাম্পেইন চলবে। প্রত্যেক টিমলিডার আজ বিকেলের মধ্যে তাঁর অধীনস্ত সকল টিম মেম্বারদের ফোন করে আগামীকালের ক্যাম্পেইন সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিবেন। আগামীকাল সকালে নির্ধারিত সময়ে এরিয়া ম্যানেজার তাঁর টিমলিডারকে সাথে নিয়ে ক্যাম্পেইনের সকল উপকরণসহ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন। টিমলিডার তাঁর নির্ধারিত প্রতিটি পয়েন্টে টিম মেম্বারদের কাছে ক্যাম্পেইনের উপকরণগুলো পৌঁছে দিবেন। অতপর প্রতিটি পয়েন্ট থেকে একযোগে ক্যাম্পেইন কার্যক্রম শুরু হবে। দিনশেষে ক্যাম্পেইনের ভালো-মন্দ দিকগুলো নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি হবে। ক্যাম্পেইনের শুরু এবং শেষ এই পর্বটুকু শুনে যে কারও মনে খটকা লাগতে পারে এত সহজেই ক্যাম্পেইন করা যায় বা এভাবে ক্যাম্পেইন করে কি কোনো ভালো ফল পাওয়া সম্ভব? এখানে আসলে পুরো প্রক্রিয়ার শেষ দৃশ্যটুকু সকলে দেখতে পাচ্ছেন। পুরো প্রেক্ষাপটটি কিন্তু ভিন্ন। শেষ দৃশ্যের কাজটুকু দেখলে মনে হবে কি সুন্দর সিস্টেম ডেভেলপ করা হয়েছে, তাই না! আসলে সিস্টেমটি এসেছে লিডারশিপ থেকে।
আমরা যখনই কোনো ক্যাম্পেইনের আয়োজন করি তখন ওই ক্যাম্পেইনে প্রমোটার হিসেবে কাজ করার জন্য অনেক লোকবল প্রয়োজন হয়। এই প্রমোটাররাই টিম মেম্বার হিসেবে পরিচিত। যাঁরা এই কাজে আসছে তাঁদের প্রায় সকলেই শিক্ষার্থী। ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি এটা তাঁদের পার্টটাইম জব। অসংখ্য শিক্ষার্থী এই কাজের জন্য আমাদের অফিসে এসে বা মেইল করে সিভি জমা দেয়। প্রতি মাসে অফিস থেকে তাঁদের জন্য গ্রুমিংয়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে ক্যাম্পেইনের নানা দিকগুলো সম্পর্কে তাঁদের শেখানো হয়। একটি প্রোডাক্ট সম্পর্কে কিভাবে তথ্য উপস্থাপন করবে, কাদের কাছে তথ্য উপস্থাপন করবে, উপস্থাপনের ধরন কেমন হবে, তাঁদের বডি ল্যাংগুয়েজ কি হবে, কারও সাথে কথা বলার সময় প্রথমে কি বলবে এবং শেষে কি বলবে, তাঁদের ড্রেসকোড কি হবে এবং এর বাইরে আরও যে সকল বিষয় রয়েছে তার সবকিছুই গ্রুমিং সেশনগুলোতে শিখিয়ে দেওয়া হয়। যাঁরা এই কাজগুলোতে উৎসাহি তাঁরা একটি বা দুটি সেশনে উপস্থিত থাকলেই বিষয়টি বুঝে নিতে পারে। কেউ যদি নিজেকে আরও বেশি পরিমাণে আত্মবিশ^াসী করে তোলতে চায় তাহলে বারবার এ ধরনের গ্রুমিং সেশনে অংশগ্রহণ করতে পারে। যেহেতু প্রতি মাসেই নতুন নতুন শিক্ষার্থীরা কাজ করতে আসে, সেহেতু প্রতি মাসেই আমাদের গ্রুমিং ক্লাশগুলো থাকে। ফলে আমাদের সুবিধা হলো কোনো ক্যাম্পেইন প্রোগ্রামের আগে প্রমোটারদের নিয়ে দফায় দফায় মিটিং সিটিং করার প্রয়োজন হয় না।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন প্রমোটার হিসেবে যাঁরাই আসছে তাঁদেরকে শুরুতেই আমরা বাছাই করে নিই। যোগ্যতার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিই না। একজন প্রমোটার কোথায় পড়ালেখা করছে, তাঁর ব্যবহার কেমন, তাঁর বডি ল্যাংগুয়েজ কেমন, কমিউনিকেশন স্কিল কেমন, তাঁর কমনসেন্স কেমন এই বিষয়গুলোর পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করেই দলে নেয়া হয়। ফলে একটি ক্যাম্পেইন প্রোগ্রাম হাতে নেয়ার পরেই আমরা বুঝতে পারি কোন ক্যাম্পেইনের জন্য কাদের বাছাই করতে হবে। অফিস থেকে নির্ধারিত ক্যাম্পেইন প্রোগ্রামের জন্য প্রমোটারদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের ই-মেইল অ্যাড্রেসে একটি গাইডলাইন দিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি এসএমএস করেও তাঁদের অবহিত করা হয়। যদি কোনো প্রমোটার ক্যাম্পেইনে অংশ নিতে না পারে তাহলে সে আগেই আমাদের অবহিত করে। আমরা তাঁর পরিবর্তে অন্য কাউকে বাছাই করি। তাছাড়া ক্যাম্পেইনের আগের দিন প্রত্যেক টিমলিডার তাঁর দলের প্রত্যেক প্রমোটারের সাথে ফোনে রি-কনফার্ম করে নেন। এভাবে কাজ করার কারণে আমাদের কাজের ফলাফল হয় অত্যন্ত ভালো। পাশাপাশি সময়, শ্রম, অর্থ সবকিছুরই সাশ্রয় হয়। প্রতিটি কাজের মধ্যেই আমরা সিস্টেম অনুসরণ করি। আর এই সিস্টেমগুলো কিন্তু লিডারশিপ বা নেতৃত্ব থেকেই আসে।
একটি ক্যাম্পেইন চলাকালীন সময়ে প্রত্যেক এরিয়া ম্যানেজার বিভিন্ন পয়েন্টগুলো পরিদর্শনে বের হন। তিনি লক্ষ্য করেন কোথাও কোনো অসংগতি হচ্ছে কিনা। কোনো জায়গায় কাজে কোনো ঘাটতি রয়েছে কিনা। প্রমোটাররা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে কিনা। যদি কোথাও কোনো ভুলভ্রান্তি তাঁর চোখে ধরা পড়ে তাহলে তিনি তা সংশ্লিষ্ট টিমলিডারকে অবহিত করেন। টিমলিডার ওই ভুলভ্রান্তির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রমোটারকে সতর্ক করেন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন, সংশোধনের জন্য পরামর্শ দেন, এমনকি প্রয়োজন হলে পরবর্তী কাজ থেকে তাঁকে বাদ দিয়ে দেন। প্রতিটি কাজ এমনভাবে করা হয় যেন সেখান থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট বের করা সম্ভব হয়। এটাই হলো ভালো নেতৃত্বের বিশেষত্ব। আমি এখানে কাজ করার সময় প্রতি মুহূর্তেই অনুধাবণ করি নেতৃত্ব কিভাবে কাজগুলোকে সুন্দরভাবে সমাপ্তি রেখায় নিয়ে যাচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত অনুধাবণ হলো এখানে প্রতিটি কাজ করার আগে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে পরিকল্পনা করা হয় এবং প্রতিটি পরিকল্পনায় যোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হয়। এটাও ভালো নেতৃত্বের একটি বহিঃপ্রকাশ।