Global Header Bottom
যেখানে যুদ্ধ সেখানেই ছুটে গিয়েছি মানবিক সাহায্য নিয়ে

সোভিয়েত ইউনিয়ন, আফগানিস্তান, রোয়ান্ডা, কঙ্গো, সুদান......

যেখানে যুদ্ধ সেখানেই ছুটে গিয়েছি মানবিক সাহায্য নিয়ে

পর্ব- ২

যেখানে যুদ্ধ সেখানেই ছুটে গিয়েছি মানবিক সাহায্য নিয়ে

এই স্বপ্নটি আরও তীব্রতা পায় ১৯৮৮ সালে। তখন সারা দেশে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ওই সময়ে আমি রাজশাহীতে ছিলাম। অফিস থেকে আমাকে ঢাকায় ডেকে আনা হলো। ঢাকায় এসে আমি হতবাক। মোহাম্মদপুরে গিয়ে দেখি সেখানে আমার বুক সমান পানি। শহরের চারদিক দিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। সারাদেশের অবস্থা আরও নাজুক। আমি দেখলাম মানুষ কত অসহায়। তখন আমার চোখে শুধু বাংলাদেশ না, সারাবিশ্বের ছবিই যেন ভেসে উঠলো। ভাবতে লাগলাম বিশ্বের নানা প্রান্তে কত কারণে কত মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে। অসহায় এই মানুষগুলোর জন্যই কিছু করার আকাঙ্খা মনের মধ্যে জেগে উঠলো। মনে মনে এটাও ভাবলাম একজন ব্যক্তির পক্ষে বেশি কিছু বা বিশেষ কিছু করা সম্ভব না। যদি কিছু করতেই হয় তাহলে কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যানার থেকেই করতে হবে। আমি যেহেতু তখন কেয়ার ইন্টারন্যাশনালে চাকরি করি তাই আরও বড় প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করলাম। অর্থাৎ জাতিসংঘ। কারণ, জাতিসংঘের চেয়ে বড় আর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। আর এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই যে কোনো বড় কাজ করা সম্ভব। আমি চাকরির জন্য আবেদন করলাম এবং প্রথম ধাপেই নির্বাচিত হলাম। বিষয়টি আমার জন্য বেশ রোমাঞ্চকর ছিল। খুশী হলাম এই ভেবে এবার মানুষের জন্য আরও বড় পরিসরে কিছু করতে পারব।

জাতিসংঘে নিয়োগ প্রাপ্তির পর আমাকে এফএও এর সদর দপ্তর ইটালীর রোমে পোস্টিং দেওয়া হলো। আমি সেখানে তিন বছর ছিলাম। ১৯৯১ সালে ইরাকে যুদ্ধ শুরু হলো। আমাকে সেখানে যেতে হলো। একই বছর অক্টোবর মাসে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গনের মুখে পড়ল। পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল। সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে মানবিক বিপর্যয়। এবার আমাকে সেখানে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের একটি প্রজেক্টে আমাকে মস্কো যেতে বলা হলো। আমি দেশে ফিরে এসে মস্কো যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন ওই সময় মস্কো সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। বিটিভি তখন একমাত্র টিভি চ্যানেল। সে সুবাদে জানতাম সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশেষ করে রাশিয়াতে বেশ ঠান্ডা পড়ে। কিন্তু কেমন ঠান্ডা সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। আমি ঢাকা থেকে বৃটিশ এয়ারওয়েজের একটি বিমানে রওনা হলাম। প্রথমে লন্ডন। তারপর মস্কো। লন্ডনে নামার পরেই আমি ঠান্ডার মুখোমুখী হলাম। মনে হলো আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। ওখানের ঠান্ডা সম্পর্কেও আমার ধারণা ছিল না। শুনেছি ঠান্ডা বেশি। তবে এমন হবে তা ভাবিনি। লন্ডনে নিজেকে সামলে নিলাম। আমি ইতিপূর্বে ওমানে কাজ করেছি, ইতালীতে কাজ করেছি। কিন্তু এ ধরনের ঠান্ডা মোকাবেলা করতে হয়নি।

লন্ডন থেকে মস্কোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বেশি দূরের পথ নয়। ঘন্টা দেড়েক পর মনে হলো নিচের দিকে যা কিছু দেখছি সবই সাদা। আমি অবাক হলাম। প্রথমে কারণটি মাথায় আসেনি। ভাবলাম মস্কো বা রাশিয়া কী সাগরের পাড়ে অবস্থিত। কারণ সাদাগুলোকে আমার কাছে পানি মনে হচ্ছিল। অল্প কিছু সময় পরেই বিষয়টি আমার কাছে পরিস্কার হলো। আসলে সেগুলো বরফ জমে সাদা হয়েছিল। তখন অনুমান করলাম রাশিয়ায় কেমন ঠান্ডা। অনেক উঁচু থেকেও বুঝতে পারলাম ঠান্ডার কারণে গাছগুলোতে কোনো পাতা নেই। পাতা ছাড়াই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বরফের এই অবস্থা দেখে আমার মনে দুশ্চিন্তা ভর করল, এ অবস্থায় বিমান ল্যান্ড করবে কীভাবে। আমি প্রচন্ডরকম অবাক হলাম রানওয়ে দেখে। রানওয়ের দু’পাশে অন্তত ত্রিশ ফুট উচ্চতায় বরফ জমে আছে। কিন্তু রানওয়েতে বরফ পড়ে জমছে না। আমি ভাবতে লাগলাম কোন প্রযুক্তি আর কীভাবে রানওয়ে বানানো হয়েছে যেখানে কোনো বরফ জমতে পারে না। ভাবতে ভাবতে দেখলাম বিমান নিরাপদে ল্যান্ড করল।

বিমান থেকে নামার পরে যেটা বুঝলাম তা হলো ভাষার ভিন্নতা। আমি বিভিন্ন দেশে কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন ভাষা সম্পর্কে অল্পবিস্তর ধারণা ছিল। ইংরেজি সম্পূর্ণ দখলে ছিল। কিন্তু ওদের ভাষা আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন এবং অচেনা। আমি শুধু কিছু শব্দ শুনতে পেলাম, কিছুই বুঝলাম না। তারপরও আমি ম্যানেজ করার চেষ্টা করলাম এবং সফল হলাম। বিপত্তি ঘটলো আমার সঙ্গে বহন করে আনা খাবার নিয়ে। এদেশের মানুষ যখন বিদেশ ভ্রমণে যায় তখন অনেকেই সাথে করে এদেশের কিছু খাবার নিয়ে যায়। বিশেষ করে ওই সময়ে এই রেওয়াজটির প্রচলন ছিল। আমার স্ত্রী কিছু মুড়ি আর বিস্কুট দিয়েছিল। মুড়ি নিয়ে ওদের আপত্তি। শেষ পর্যন্ত আমি খেয়ে দেখাতে বাধ্য হলাম এটা খেলে মানুষ মরে না। এয়ারপোর্টের আকার দেখে চমকে উঠলাম। এর আগে বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্ট দেখেছি। কিন্তু এত বড় এয়ারপোর্ট কখনো দেখিনি। এয়ারপোর্ট থেকে মস্কোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গাড়িতে প্রায় তিন ঘন্টার পথ। গাড়ি ছুটে চলেছে। রাস্তার দু’ধারে অনেক উঁচু উঁচু ভবন। ভবনগুলো যেমন উঁচু তেমন চওড়া। দেখেই মনে হলো অনেক মজবুত। রাস্তাগুলোও অনেক চওড়া। একসাথে আটটি গাড়ি চলাচল করতে পারে। ভাবতে কষ্ট হলো এমন একটি দেশ কীভাবে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। এই ভাঙ্গন শুরু হওয়ার আগে এক ডলারের বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের নব্বই পয়সা পাওয়া যেত। অর্থাৎ রুবলই শক্তিশালী ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ হাজার নতুন রুবলের বিনিময়ে এক ডলার পাওয়া যেত।

(চলবে)

“ড. মারুফ উল ইসলাম বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী| ছেলেবেলা কেটেছে জন্মস্থান খুলনায়| পড়ালেখা ব্যবসায় অনুষদে| অর্জন করেছেন সর্বোচ্চ ডিগ্রি| বিদেশী প্রতিষ্ঠানে চাকরির স্বপ্ন ছাত্রজীবন থেকে| ১৯৮২ সালে কর্মজীবন শুরু| প্রথমে কেয়ার ইন্টারন্যাশনালে| তারপর জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামে| প্রথমে দেশে অতপর ওমান, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আফগানিস্তান, রোয়ান্ডা, কঙ্গো, সুদান| ঘুরতে হয়েছে আরও অনেক দেশ| যেখানে যুদ্ধ সেখানেই ছুটে গিয়েছেন মানবিক সাহায্য নিয়ে| চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন| তবে থেমে নেই পথচলা| বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন| রয়েছেন আরও নানা কাজের সাথে জড়িত| তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েই এই লেখা”

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer