Global Header Bottom
শিক্ষা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঞ্জিন

শিক্ষা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঞ্জিন

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের শিক্ষা

শিক্ষা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঞ্জিন

সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক সাফল্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা সাধারণত তার আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ প্রশাসন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কিংবা বিশ্বমানের বন্দর ও আর্থিক খাতের কথা বলি। কিন্তু এসব দৃশ্যমান সাফল্যের পেছনে যে অদৃশ্য শক্তিটি কয়েক দশক ধরে কাজ করেছে, সেটি হলো মানুষকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার একটি পরিকল্পিত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নব্যবস্থা।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটির সাফল্যের শিক্ষা এই নয় যে বেশি মানুষকে বেশি ডিগ্রি দিতে হবে। বরং শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় আয়ে রূপান্তরিত হয়। এই জায়গাতেই শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্কটি নতুনভাবে বোঝা প্রয়োজন।

শিক্ষা কি ব্যয়, নাকি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ?

একটি রাষ্ট্র যখন বিদ্যালয় নির্মাণ করে, শিক্ষক নিয়োগ দেয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে কিংবা কারিগরি প্রশিক্ষণে অর্থ ব্যয় করে, তখন হিসাবের খাতায় সেটি সরকারি ব্যয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই অর্থ যদি একজন মানুষকে অধিক দক্ষ, উৎপাদনশীল ও উদ্ভাবনী করে তোলে, তবে সেটি আর নিছক ব্যয় থাকে না; মানবসম্পদে বিনিয়োগ-এ পরিণত হয়। সিঙ্গাপুর এই সত্যটি তার উন্নয়নের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই উপলব্ধি করেছিল। ১৯৬৫ সালে স্বাধীন হওয়ার সময় দেশটির বিশাল ভূখণ্ড, বিপুল খনিজসম্পদ কিংবা কৃষির জন্য পর্যাপ্ত জমি ছিল না। প্রচলিত অর্থে প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ ছিল সীমিত। তাই দেশটির সামনে কার্যত একটি বড় সম্পদই ছিল-মানুষ। কিন্তু মানুষ নিজে থেকেই অর্থনৈতিক সম্পদ নয়। উপযুক্ত শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, কাজের সংস্কৃতি এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমেই মানুষ কার্যকর মানবসম্পদে পরিণত হয়। সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল এই রূপান্তর।

আগে অর্থনীতির প্রয়োজন, তারপর সেই অনুযায়ী শিক্ষা

সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো-দেশটি শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে দুটি বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্র হিসেবে দেখেনি। অর্থনীতি যখন শ্রমনির্ভর শিল্পায়নের দিকে এগিয়েছে, তখন প্রয়োজন হয়েছে মৌলিক শিক্ষা ও শিল্পের উপযোগী কর্মী। উৎপাদনব্যবস্থা যখন ইলেকট্রনিকস ও উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী উৎপাদনের দিকে গেছে, তখন কারিগরি শিক্ষা, প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের গুরুত্ব বেড়েছে। পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি যখন আর্থিক সেবা, উন্নত উৎপাদন, জীবপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা এবং জ্ঞাননির্ভর শিল্পের দিকে অগ্রসর হয়েছে, তখন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে;

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ চাহিদা → প্রয়োজনীয় দক্ষতা চিহ্নিতকরণ → শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ → দক্ষ মানবস¤পদ → উৎপাদনশীলতা → বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন → উচ্চতর আয়।

এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। আমরা কি শিক্ষার্থীদের প্রথমে ডিগ্রি দিচ্ছি এবং পরে তাঁদের চাকরি খুঁজতে বলছি? নাকি আগামী ১০-২০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন ধরনের দক্ষতা চাইবে, সেটি আগে নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী শিক্ষার্থী তৈরি করছি? এই দুটি পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্যই ডিগ্রিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থনীতির চাহিদানির্ভর মানবসম্পদ ব্যবস্থার পার্থক্য।

ডিগ্রির সংখ্যা নয়, দক্ষতার অর্থনৈতিক মূল্য

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং পরিবারগুলোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির আকাঙ্ক্ষাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এখানেই আমাদের একটি কঠিন প্রশ্ন করতে হবে-একটি ডিগ্রি অর্থনীতিতে কতটা মূল্য সৃষ্টি করছে? একজন শিক্ষার্থী চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেন এবং একটি সনদ পেলেন; কিন্তু তাঁর অর্জিত জ্ঞান যদি শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, যদি তিনি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারেন, সমস্যা সমাধান করতে না পারেন, নতুন কিছু সৃষ্টি করতে না পারেন কিংবা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতায় দৃশ্যমান অবদান রাখতে না পারেন, তাহলে ডিগ্রির সামাজিক মূল্য থাকলেও তার অর্থনৈতিক মূল্য সীমিত হয়ে যেতে পারে। সিঙ্গাপুরের শিক্ষা দর্শন থেকে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়-শিক্ষার সমাপ্তি শুধু সনদ অর্জনে নয়; এর প্রকৃত পরিণতি সক্ষমতা অর্জনে। অর্থাৎ শিক্ষার চূড়ান্ত ফল শুধু সনদ নয়, সক্ষমতা।

কারিগরি শিক্ষাকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা ভাবলে চলবে না

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং- টিভিইটি) -এর অবস্থান। আমাদের সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা রয়েছে যে সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে এবং যাঁরা সেখানে যেতে পারবে না তাঁরা কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যাবে। ফলে কারিগরি শিক্ষা অনেক সময় শিক্ষার্থীর প্রথম পছন্দের পরিবর্তে বিকল্প পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক অর্থনীতি কিন্তু এভাবে কাজ করে না। উন্নত উৎপাদন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, রোবটপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, সরবরাহব্যবস্থা, নির্মাণপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি কিংবা ডিজিটাল সেবায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী নয়, প্রয়োজন উচ্চ দক্ষতাস¤পন্ন কারিগরি কর্মী ও প্রযুক্তিবিদ। সিঙ্গাপুরের কারিগরি শিক্ষা ইনস্টিটিউট (ইন্সটিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন-আইটিই) এবং পলিটেকনিক ব্যবস্থা এই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে বিকশিত হয়েছে। শিক্ষার বিভিন্ন পথের সঙ্গে শ্রমবাজার ও শিল্পের বাস্তব চাহিদার সংযোগ তৈরির চেষ্টা সেখানে সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ যদি দ্রুত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন চায়, তাহলে আমাদেরও প্রশ্ন করতে হবে-আমাদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শিল্পনীতি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে যথেষ্ট সংযুক্ত?

শিক্ষকই শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্র

শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা তুলনামূলক সহজ। নতুন বই লেখা যায়, নতুন বিষয় যোগ করা যায়, নতুন ভবন নির্মাণ করা যায়। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে একজন দক্ষ শিক্ষক ছাড়া এসব পরিবর্তনের অনেকটাই প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না। সিঙ্গাপুর শিক্ষকতার মান, শিক্ষক প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছে। এখানেও বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। আমরা শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই শিক্ষাক্রম, পরীক্ষা, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু একটি প্রশ্ন তুলনামূলক কম গুরুত্ব পায়-যিনি শিক্ষার্থীকে শেখাবেন, সেই শিক্ষকের নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা কত দ্রুত হালনাগাদ হচ্ছে? বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে দশ বছর আগের জ্ঞান দিয়ে আগামী দশ বছরের শিক্ষার্থী তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষক উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন বা মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণ হিসেবে না দেখে ধারাবাহিক পেশাগত শিক্ষা ও উন্নয়নব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়

একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থী ভর্তি করা, ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষা নেওয়া এবং সনদ দেওয়া হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে, গবেষণাকে বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, শিল্পের সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং নতুন প্রযুক্তি, নতুন ব্যবসায়িক কাঠামো ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। সিঙ্গাপুরের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরির প্রচেষ্টা। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন পরবর্তী প্রশ্ন হওয়া উচিত-আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতগুলো ডিগ্রি দিচ্ছে, তার পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটুকু নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবনের স্বত্ব (প্যাটেন্ট), নতুন উদ্যোগ (স্টার্টআপ), নীতিগত সমাধান এবং দক্ষ মানবস¤পদ যোগ করছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের সূচক শুধু স্নাতকের সংখ্যা হলে শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ অর্থনীতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থেকে যেতে পারে।

একটি ডিগ্রি দিয়ে পুরো কর্মজীবন নয়

বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, রোবটপ্রযুক্তি, উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল মঞ্চ অনেক পেশার চরিত্র পরিবর্তন করছে। আজ একজন শিক্ষার্থী যে দক্ষতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছেন, তার একটি অংশ হয়তো পাঁচ বা দশ বছরের মধ্যে অপ্রচলিত হয়ে যাবে। সিঙ্গাপুরের স্কিলসফিউচার উদ্যোগের অন্তর্নিহিত দর্শন এখানেই গুরুত্বপূর্ণ-স্নাতক হওয়ার সঙ্গে শেখার সমাপ্তি ঘটে না। অর্থাৎ শিক্ষার একটি শেষ তারিখ নেই। বাংলাদেশেও আমাদের শিক্ষা ধারণাকে বিদ্যালয় → কলেজ → বিশ্ববিদ্যালয় → চাকরি এই সরল রেখা থেকে বের করে আনতে হবে। তার পরিবর্তে প্রয়োজন;

শিক্ষা → কর্মসংস্থান → পুনঃদক্ষতা অর্জন → কর্মসংস্থান → দক্ষতা উন্নয়ন → উদ্ভাবন → আজীবন শিক্ষা মানুষ তাঁর কর্মজীবনে বারবার শিখবে, দক্ষতা পরিবর্তন করবে এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে অভিযোজিত করবে।

শিক্ষা থেকে জাতীয় আয়-সংযোগটি কোথায়?

এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত এটিই। শুধু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেই একটি দেশ ধনী হয় না। শিক্ষাকে কয়েকটি মধ্যবর্তী ধাপ অতিক্রম করে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে হয়।

মানসম্মত শিক্ষা → প্রাসঙ্গিক জ্ঞান ও দক্ষতা → কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সক্ষমতা → শ্রম উৎপাদনশীলতা → প্রযুক্তি গ্রহণ ও উদ্ভাবন → উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী শিল্প → রপ্তানি ও বিনিয়োগ সক্ষমতা → উচ্চতর আয় → জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

অর্থাৎ শিক্ষা খাতে ব্যয় এবং মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির মাঝখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি হলো উৎপাদনশীলতা। একজন মানুষের শিক্ষার কারণে যদি তাঁর উৎপাদনশীলতা না বাড়ে, তাহলে, শিক্ষার অর্থনৈতিক প্রতিদান সীমিত থাকবে। আর লক্ষ লক্ষ মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়লে সেটিই সামগ্রিকভাবে দেশের উৎপাদন, আয় এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় প্রতিফলিত হতে পারে। এই জায়গাটিই বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

সিঙ্গাপুরকে অনুকরণ নয়, নীতিটি বুঝতে হবে

এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। সিঙ্গাপুর এবং বাংলাদেশ এক নয়। সিঙ্গাপুর একটি ছোট নগররাষ্ট্র; বাংলাদেশের রয়েছে প্রায় ১৭ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠী, বৃহৎ গ্রামীণ অর্থনীতি, ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো এবং ব্যাপক আঞ্চলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্য। তাই সিঙ্গাপুরের মডেল সরাসরি বাংলাদেশে

অনুলিপি করা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সিঙ্গাপুরের মূল নীতি থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। আর সেই নীতি হলো-শিক্ষানীতি এবং অর্থনৈতিক নীতিকে একই ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সামনে রেখে পরিচালনা করা। বাংলাদেশ যদি অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি (সেমিকন্ডাকটর), ইলেকট্রনিকস, ওষুধশিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব শিল্প, উন্নত বস্ত্রশিল্প কিংবা জ্ঞানভিত্তিক সেবায় আগামী দুই দশকে শক্তিশালী হতে চায়, তাহলে আজকের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনায় সেই ভবিষ্যতের প্রতিফলন থাকতে হবে। কারণ ২০৪১ সালের কর্মশক্তি ২০৪১ সালে তৈরি করা যাবে না। তাদের একটি বড় অংশ আজই আমাদের স্কুল, কলেজ, পলিটেকনিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সাতটি শিক্ষা

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতিগত শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, শিক্ষা পরিকল্পনাকে জাতীয় অর্থনৈতিক ও শিল্প কৌশলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাক্রমকে ডিগ্রিকেন্দ্রিক না রেখে দক্ষতা ও সক্ষমতাকেন্দ্রিক করতে হবে। তৃতীয়ত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মর্যাদাপূর্ণ এবং শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত কর্মজীবনের পথ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষক উন্নয়নকে ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অংশ করতে হবে। পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প-সরকার সহযোগিতা বাড়িয়ে গবেষণাকে উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিক প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ষষ্ঠত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপাত্ত, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং উদীয়মান প্রযুক্তিকে সব শাখার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। সপ্তমত, আজীবন শিক্ষা, পুনঃদক্ষতা অর্জন এবং দক্ষতা উন্নয়নের একটি জাতীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি প্রশ্নই থাকতে হবে-আমরা কতজন স্নাতক তৈরি করছি, সেটি নয়; আমরা কতজন অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম মানুষ তৈরি করছি?

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স¤পদও মানুষ

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু আমাদের রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীকে আমরা প্রায়ই আমাদের শক্তি হিসেবে বর্ণনা করি। কিন্তু জনসংখ্যা নিজে থেকেই জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) নয়। অদক্ষ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে; দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীই প্রকৃত জনমিতিক লভ্যাংশ। এখানেই সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। সিঙ্গাপুর আমাদের শেখায় যে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতজন স্কুলে গেল, কতজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো কিংবা কতজন ডিগ্রি পেল-এসব দিয়ে বিচার করলে চলবে না। শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে সেই শিক্ষা মানুষের উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়িয়েছে, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা কতটা সৃষ্টি করেছে, উদ্ভাবন কতটা উৎসাহিত করেছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে কতটা নতুন মূল্য সংযোজন করেছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন বিস্তার থেকে রূপান্তরের দিকে যাওয়া-সংখ্যা থেকে মানে, সনদ থেকে সক্ষমতায় এবং শিক্ষা থেকে উৎপাদনশীলতায়। সিঙ্গাপুরের সাফল্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই হয়তো কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাক্রম বা শিক্ষা প্রকল্প নয়। শিক্ষা হলো একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ-এই উপলব্ধি।

আমাদেরও এখন প্রশ্ন করার সময় এসেছে: আমরা কি শুধু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করতে চাই, নাকি এমন মানবস¤পদ তৈরি করতে চাই যাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাবে? যেদিন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হবে, সেদিন শিক্ষা আর শুধু একটি সামাজিক খাত থাকবে না-শিক্ষাই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন।

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer