পর্ব- ২
পণ্য বিক্রি: কথার ফুলঝুড়ি কতক্ষণ?
ঘটনা ৬
গত সংখ্যায় একটি টিমের যে পাঁচজন সম্পর্কে বলা হয়েছে ওই টিমের আরেকজন সদস্য মিতুল। সেলস টিমের বসের নিকট মিতুলের গুরুত্ব অন্যদের তুলনায় খানিকটা বেশি। বেশি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ওর সেলস এর পরিমাণ ভালো। অন্য পাঁচজনের তুলনায় অনেক বেশি। বেশি হওয়ার কারণ হলো অন্যদের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের প্রায় সবগুলোই ওর মধ্যে রয়েছে। বসের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো সেলস সম্পর্কিত ওর চিন্তাভাবনা বসকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। সেলস এর বিভিন্ন দিক নিয়ে মিতুল বসের সাথে আলোচনা করে। বিভিন্ন মিটিংয়ে মিতুল পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের সাহায্যে বিজনেস প্ল্যান উপস্থাপন করে। নতুন নতুন আইডিয়া ডেভেলপ করে। প্রতিটি আইডিয়াকে আবার গাণিতিকভাবে প্রমাণ করে বুঝিয়ে দেয়। বিদেশি বিভিন্ন জার্নালের রেফারেন্স দিয়ে কথা বলে। বিভিন্ন কেস স্ট্যাডি তুলে ধরে। সেলস ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কিত বিখ্যাত লেখকদের বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করে। ওর কথার মধ্যে আত্মবিশ^াস রয়েছে। কেউ ওর সাথে কথা বললে ওর জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। মিতুল পড়–য়া ছেলে। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে ওর রয়েছে ভালো ফলাফল। এছাড়া এখনো সেলস নিয়ে প্রতিনিয়ত অনলাইনে বিদেশি জার্নাল পড়ছে। দেশে সেলস সম্পর্কিত বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, সেমিনারে হাজির হচ্ছে। একজন সফল সেলসম্যান হিসেবে প্রমাণ করার জন্য প্রতিনিয়ত নিজেকে ডেভেলপ করছে।
এখানে উল্লেখিত ছয়টি ঘটনা আমরা বাস্তবক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করছি। যে সেলস টিমে মিতুলের মতো সেলসম্যান রয়েছে ওই টিমের পণ্য বিক্রি হবে এটাই স্বাভাবিক। একজন সেলসম্যান বা এক্সিকিউটিভ শুধু ভালো ব্যবহার বা গুছিয়ে কথা বলার ক্যারিশমা দিয়ে সব সময় কাস্টমারকে আকৃষ্ট করতে পারে না। তাঁকে সত্যিকার অর্থেই সেলসম্যানের ক্যারিশমাগুলো আয়ত্ব করতে হয়। আর এই ক্যারিশমাগুলোই ছয়টি ঘটনায় বলা হয়েছে। তবে এখানেই শেষ কথা নয়। যদি কোম্পানির পণ্য ভালো না হয় তাহলে কি মিতুলের মতো সেলসম্যানেরা ওই পণ্য বিক্রি করতে পারবে? হ্যাঁ পারবে। কারণ তাঁকে তখন সত্য-মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কাস্টমারকে বুঝাতে হবে। সকল কাস্টমারকে কনভিন্স করতে না পারলেও কেউ কেউ কথার যাদুতে হিপ্নোটাইজ হবে। কিন্তু এরপর কি হবে? ওই কাস্টমার একবার ঠকবে। দুইবার ঠকবে। খুব বেশি হলে তিনবার ঠকবে। তারপর কি হবে? ওই কাস্টমার সারাজীবনের জন্য ওই ব্র্যান্ডকে বয়কট করবে। কোম্পানিকে বয়কট করবে। তিনি শুধু নিজে ওই পণ্য কেনা বন্ধ করবে না। তাঁর নিকটজন সকলকেই ওই পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করবে। অবস্থা এমন দাঁড়াবে তিনি তাঁর ক্ষোভ প্রকাশের জন্য সমস্ত রাগঝাল ঝেড়ে কথা বলবে। আর ওই যে বলা হলো তিনবার ঠকবে। বাস্তবে তা সাধারণত হয় না। কাস্টমার একবার ঠকলেই ওই ব্র্যান্ডের প্রতি আর আকৃষ্ট হতে চায় না।
আমরা অনেক সময় একটি কথা শুনি চাপাবাজি করতে পারলেই নাকি পণ্য সেল বা মার্কেটিং করা যায়। আবার কেউ কেউ এভাবে বলে মার্কেটিং হলো চাপাবাজির সাবজেক্ট। চাপাবাজি আর মার্কেটিং কী এক জিনিস? মার্কেটিং তো অনেক বড় একটি বিষয়। মার্কেটিং সম্পর্কে ভালো মতো জ্ঞান অর্জন করতে হলে বিশে^র সেরা মার্কেটিং অধ্যাপকদের লেখা অন্তত ২০টি বই পড়তে হবে। এই বিশটি বইতে কমপক্ষে ১০ হাজার পৃষ্ঠা পড়তে হবে। আমি ওই ১০ হাজার পৃষ্ঠা প্রসঙ্গে যাব না। ২০টি বইয়ের মধ্যে যে বইটি প্রথমে পড়া প্রয়োজন সেটা হচ্ছে প্রিন্সিপলস অব মার্কেটিং। এই বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে মাত্র কয়েক লাইনের একটি সংজ্ঞা পাওয়া যাবে। সংজ্ঞাটির মর্মকথা বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে “মার্কেটিং ক্রেতার জন্য সর্বোচ্চ ভ্যালু সৃষ্টি করে। এই ভ্যালু সৃষ্টির মাধ্যমে ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করে। ফলে ক্রেতা সন্তুষ্ট হয়ে বারবার ওই একই পণ্য ক্রয় করে। বারবার একই পণ্য কেনার কারণে ওই ব্র্যান্ড তথা কোম্পানির সাথে ক্রেতার দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হয়, যা কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করে।” এখানে যে ভ্যালুর কথা বলা হয়েছে তা দ্বারা মূলতঃ ক্রেতাকে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সর্বোচ্চ ভ্যালু অর্থাৎ সর্বোচ্চ সুবিধা। যে সাবজেক্ট সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়ে ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করার কথা বলে সেই সাবজেক্ট চাপাবাজির সাবজেক্ট কি করে হয় তা বোধগম্য নয়। আসলে বিষয়টি হলো ওই যে ১০ হাজার পৃষ্ঠার জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে সেটা তো তাঁদের নেই-ই, বরং প্রথম পৃষ্ঠার কয়েক লাইনের জ্ঞানও তাঁদের নেই। ফলে উন্মাদের মতো বলে ফেলে মার্কেটিং চাপাবাজির সাবজেক্ট। ভুল তথ্য পরিবেশন করে পণ্য বিক্রির কথা মার্কেটিং কখনো বলে না। যদি মার্কেটার পণ্য বিক্রির জন্য ভুল তথ্য পরিবেশন করে সেটা মার্কেটারের ব্যর্থতা, অজ্ঞতা, অযোগ্যতা। সেটা মার্কেটিংয়ের কোনো ব্যর্থতা নয়। বিশেষ কিছু ওষুধ তৈরির জন্য অ্যালকোহল প্রয়োজন। এই অ্যালকোহল যদি কেউ নেশার কাজে ব্যবহার করে তাহলে সেটা নেশাখোরের দোষ, অ্যালকোহল আবিস্কারকের নয় এই সাধারণ কথাটুকু বোঝার মতো জ্ঞান না থাকলে তখন কারও কারও কাছে মার্কেটিং চাপাবাজি, ধোঁকাবাজি বা আরও অনেক কিছুই মনে হতে পারে।
একজন মার্কেটারের মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য বিল্ট-ইন থাকতে হয়। বৈশিষ্ট্য তিনটি হলো ক্রিয়েটিভ, ইনোভেটিভ এবং কমিউনিকেটিভ। মার্কেটার সব সময় ক্রেতার জন্য নতুন নতুন পণ্যের কথা ভাববে। একই পণ্য দিয়ে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ক্রেতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করবে না। কারণ ক্রেতার চাহিদা, রুচি, সামর্থ্য পরিবর্তন হয়। ফলে মার্কেটারকেও তাঁর পণ্যের মধ্যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন করতে হয়। মার্কেটারকে ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে নতুন নতুন পণ্য বাজারে ছাড়তে হয়। বিশে^র যে কোম্পানিগুলো শত বছর ধরে বা আরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছে তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলেই এই কথার সত্যতা পাওয়া যায়। টয়োটা গাড়ি মডেল পরিবর্তন করছে। স্যামসাং পণ্যের মধ্যে পরিবর্তন করছে। নাইকি’র কেডস এ প্রতি বছর নতুন কিছু যুক্ত হচ্ছে। শুধু উদ্ভাবন করেই কোম্পানিগুলো থেমে থাকছে না। পণ্যের দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন মার্কেটিংয়ের ক্রিয়েটিভিটির বহিঃপ্রকাশ করছে। এই কাজগুলো মার্কেটারকে করতে হচ্ছে। আমরা আমাদের দেশের ম্যাংগো জুস কেনার সময় পণ্যের মান নিয়ে শংকিত হই। কিন্তু কোনো কোনো ব্র্যান্ডের ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কেনার সময় স্বাচ্ছন্দেই কিনে থাকি। এটার মূল কারণ ওই ব্র্যান্ডের প্রতি ক্রেতার মনোভাব। একজন প্রকৃত মার্কেটার কখনো চিৎকার করে বলেন না তোমরা আমার পণ্য ক্রয় কর। তাঁর কাজগুলোই ক্রেতাকে তাঁর পণ্যের দিকে নিয়ে আসে। আমাদের দেশে কিছু বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় ল্যাপটপ দিয়েও ছাত্র ভর্তি করতে পারে না। আবার কোনো কোনো বিশ^বিদ্যালয়ের খরচ ওই সকল বিশ^বিদ্যালয় অপেক্ষা অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে হয়। এভারকেয়ার হাসপাতাল রোগীদের আকৃষ্ট করার জন্য কোনো কমিশন এজেন্ট নিয়োগ করে না কিংবা লিফলেট, সাইনবোর্ড ব্যবহার করে না। এমনকি ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ায় কোনো ক্যাম্পেইনও করে না। এভারকেয়ারের মার্কেটার শুধু তাঁদের ডাক্তারদের পরিচিতি পত্রিকায় প্রকাশ করেন। আর তাতেই রোগীরা সেখানে ভিড় জমায়। কারণ ওই ডাক্তাররাই দেশের সেরা ডাক্তার বা ভারতের প্রখ্যাত ডাক্তার। মার্কেটার রোগীদের জন্য কোন মানের ডাক্তারদের সমাবেশ ওখানে ঘটিয়েছেন এটাই মার্কেটার প্রচার করেন। রোগীদের আকৃষ্ট করার জন্য এর চেয়ে বেশি তাঁকে আর কিছু করতে হয় না। তবে হ্যাঁ, সার্ভিস মার্কেটিং করার জন্য “সেভেন পি” এর ব্যবহার তিনি যথার্থই করেছেন। আর এটাও মার্কেটিংয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
কোনো পণ্য বিক্রির সম্মুখভাগে থাকে সেলসম্যান বা সেলস এক্সিকিউটিভ বা সেলস অফিসার। প্রতিষ্ঠান ভেদে এদের ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যে নামেই ডাকা হোক না কেন একজন সেলস অফিসার নিজে যদি সেলস সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না রাখে, তিনি যতই বাকপটু হোক না কেন তাঁর পক্ষে বেশিদূর যাওয়া সম্ভব না। আবার কোম্পানি যদি ভালো পণ্য বাজারে না ছাড়ে তাহলেও ওই পণ্য নিয়ে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব না। তাই কোনো পণ্য মার্কেটিং করতে হলে, সেল করতে হলে শুধু কথার ওপর নির্ভর করে তা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সেলস এক্সিকিউটিভকে যেমন সেলস সম্পর্কিত জ্ঞানগুলো অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে সেভাবেই বাজারে নামতে হবে যেন সেলস ফোর্স তাঁদের কাজগুলো করার সময় পণ্যের ওপর পূর্ণ বিশ^াস নিয়েই মাঠে নামতে পারে। তাহলেই পণ্য বিক্রয় শুধু কথার ফুলঝুড়িতে আবদ্ধ থাকবে না। শেষ কথা হলো প্রোডাক্ট সেল তো মার্কেটিংয়ের প্রায় শেষ ধাপের কাজ। তার আগে কত শত কাজ করতে হয় সেটার খবর কয়জন রাখে। আর ওই কাজগুলোই হলো মার্কেটিংয়ের মূল কাজ যেগুলো পর্যাপ্ত মার্কেটিং জ্ঞান ছাড়া কখনো সঠিকভাবে করা সম্ভব না। মার্কেটিংয়ের ওই কাজগুলো ভালোভাবে সম্পন্ন হলেই একটি পণ্য বাজারে ক্রেতাদের দ্বারা সমাদৃত হয়। আর এটা করতে না পারলে তখন কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করতে হয়, যা কখনো কোনো ব্র্যান্ড বা কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে টিকে থাকতে সহায়তা করে না।
(সমাপ্ত)
সম্পাদক, বাজারজাতকরণ