আপনার অগ্রগতির পথে অন্তরায়
ক্র্যাব মেন্টালিটি বা কাঁকড়া মানসিকতা
ক্র্যাব মেন্টালিটি বা কাঁকড়া মানসিকতা কী?
“ক্র্যাব মেন্টালিটি” একটি মনস্তাত্ত্বিক শব্দগুচ্ছ, যা মানুষের এক ধরনের সংকীর্ণ ও ঈর্ষাপরায়ণ আচরণকে নির্দেশ করে। সহজ কথায়, এর মূল কথা হলো “আমি যদি না পারি, তবে তোমাকেও পারতে দেব না।”
কাঁকড়ার উদাহরণ থেকে নামকরণ
একটি খোলা বালতিতে যদি অনেকগুলো কাঁকড়া একসাথে রাখা হয়, এবং কোনো একটি কাঁকড়া যদি বালতি থেকে বেরিয়ে ওপরে উঠার বা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, সেক্ষেত্রে বাকি কাঁকড়াগুলো ওটাকে টেনে নিচে নামিয়ে ফেলে। ফলে কোনো কাঁকড়ার পক্ষেই আর মুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না। মানুষের মধ্যেও যখন কেউ কাউকে ওপরে উঠতে না দিয়ে টেনে নিচে নামানোর চেষ্টা করে, তখন সেটাকে “ক্র্যাব মেন্টালিটি” বা কাঁকড়ার মানসিকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ক্র্যাব মেন্টালিটি তৈরি হওয়ার কারণ
আমরা আমাদের চারিপাশে যদি একটু দৃষ্টি দিই তাহলে দেখা যাবে এ ধরনের মনমানসিকতার মানুষের সংখ্যা কম নয়। বিশেষকরে কর্মক্ষেত্রে এই মানুষগুলোর উপস্থিতি বেশ লক্ষ্যণীয়। কর্মক্ষেত্রে এদের সংখ্যাধিক্য হওয়া আকস্মিক কোনো বিষয় নয়। কর্মজীবনের আগে নিজের সাথে অপরের তুলনা খুব বেশি গভীরভাবে বিবেচনা করা হয় না। অল্প বয়সে এটা নিয়ে অনেকে কোনো মাথাও ঘামায় না। কিন্তু কর্মজীবন শুরু হলেই আমাদের অনেকের মধ্যে এমন একটি মনোভাব জাগ্রত হয় “আমার তো কোনো অসুখ নেই, তোমার সুখ আমার অসুখ”- অতএব তোমাকে আমার ওপরে উঠতে দেব না। মানুষের মধ্যে হিংসার বীজ থেকেই এ ধরনের মনোভাবের উৎপত্তি। মানুষ কেন এমন আচরণ করে, এর পেছনে গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে।
তীব্র হীনম্মন্যতা
নিজের যোগ্যতা বা সাফল্য নিয়ে যখন কেউ চরম অসন্তুষ্টিতে ভোগে, তখন অন্যের সাফল্য তাঁকে নিজের ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই হীনম্মন্যতা থেকে অন্যের ক্ষতি করার ইচ্ছা জাগে।
অন্ধ ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতা
অন্যের ভালো থাকা, প্রশংসা পাওয়া বা ওপরে উঠে যাওয়া ক্র্যাব মেন্টালিটির মানুষেরা সহ্য করতে পারে না।
প্রতিযোগিতার ভুল ধারণা
এ ধরনের মানুষেরা মনে করে পৃথিবীর সব সুযোগ সীমিত। কেউ একজন সফল হওয়া মানে নিজের সুযোগ কমে যাওয়া। এই ভুল বিশ্বাস থেকে তাঁরা অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করে।
অনিরাপত্তা বোধ
আশেপাশের কেউ সফল হলে নিজের অবস্থান বা গুরুত্ব হারিয়ে যাওয়ার ভয় এদের তাড়া করে বেড়ায়।
পারিবারিক বা সামাজিক পরিবেশ
কোনো ব্যক্তি যদি ছোটবেলা থেকে এমন এক পরিবেশে বড় হয় যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা নয়, বরং অন্যকে টেনে নামানোর সংস্কৃতি বিদ্যমান, তাহলে তাঁর মধ্যেও এই মানসিকতা তৈরি হয়।
ক্র্যাব মেন্টালিটির মানুষ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার উপায়
এ ধরনের নেতিবাচক মানুষ আমাদের কর্মক্ষেত্রে, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কিংবা বন্ধুমহলে এমনকি পরিবারেও থাকতে পারে। এদের থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন
লক্ষ্য ও পরিকল্পনা গোপন রাখুন
আপনার বড় কোনো স্বপ্ন, নতুন প্রজেক্ট বা সাফল্যের পরিকল্পনা শুরুর আগেই সবার সামনে প্রকাশ করবেন না। কাজ নিরবে শেষ করুন এবং সাফল্যকে নিজে কথা বলতে দিন। ক্র্যাব মেন্টালিটির মানুষেরা আগে জানতে পারলে আপনার কাজে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করবে। আপনার সামনে নানা ধরনের নেতিবাচক বিষয় তুলে ধরবে।
মানসিক দূরত্ব বজায় রাখুন
যদি এ ধরনের মানুষ আপনার খুব কাছাকাছি থাকে (যেমন কর্মক্ষেত্রে বা পরিবারে) যাঁদের এড়ানো সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে তাঁদের সাথে আবেগগতভাবে জড়াবেন না। তাঁদের উস্কানিমূলক বা নেতিবাচক কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। আপনার উদাসীনতা তাঁদের টেনে নামানোর উৎসাহ কমিয়ে দেবে।
নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখুন
তাঁরা আপনার আত্মবিশ্বাসে আঘাত করার জন্য বিভিন্ন সমালোচনা বা উপহাস করতে পারে। মনে রাখবেন তাঁদের সমালোচনা আপনার যোগ্যতার অভাব নয়, বরং তাঁদের নিজেদের ভেতরের হিংসার বহিঃপ্রকাশ। নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকুন।
একটি পজিটিভ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন
এমন মানুষদের সাথে মেলামেশা বাড়ান যাঁরা আপনাকে অনুপ্রেরণা দেয়, আপনার সাফল্যে আনন্দিত হয় এবং আপনাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। একটি ইতিবাচক বৃত্ত আপনাকে নেতিবাচকতার দেয়াল থেকে সুরক্ষিত রাখবে।
তর্কে জড়ানো থেকে বিরত থাকুন
ক্র্যাব মেন্টালিটির মানুষদের বোঝানোর বা পরিবর্তন করার চেষ্টা করা বৃথা। তর্কে জড়িয়ে নিজের মূল্যবান সময় ও মানসিক শক্তি নষ্ট করবেন না। আপনার নীরবতা এবং চূড়ান্ত সাফল্যই হবে তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় জবাব।
সবশেষে একটি ছোট্ট কথা, সমাজের এই টেনে নামানোর সংস্কৃতিকে জয় করার একমাত্র উপায় হলো নিজের গতি সচল রাখা। কাঁকড়ারা টেনে নামানোর চেষ্টা করবেই, কিন্তু আপনার ডানা যদি শক্ত হয়, আপনি ঠিকই উড়ে সীমানা পার হয়ে যেতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় আপনাকে মনে রাখতে হবে। আপনাকে প্রতিনিয়ত আপনার যোগ্যতাকে শাণিত করতে হবে। আপনি যোগ্য এটা শুধু আপনি বললে হবে না। আপনার কাজ দিয়ে সেটা প্রমাণ করতে হবে। আপনার কাজের প্রতিফলন প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় দৃশ্যমান হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের মুনাফা শুধু সেলস আর মার্কেটিং বিভাগের কাজ দিয়ে আসে না। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগের এবং প্রত্যেক কর্মীর সমন্বিত প্রচেষ্টায়ই মুনাফা আসে। প্রতিষ্ঠান বড় থেকে আরও বড় হয়। সেখানে আপনার অবদানকে সুস্পষ্ট করতে হবে।
হেড, এইচআর অ্যান্ড এ্যাডমিন, ইস্টার্ন সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড