পর্ব- ২
ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?
বাজারে কোনো পণ্য ছাড়ার আগে ওই পণ্য থেকে ক্রেতারা কী প্রত্যাশা করে সেটা একজন মার্কেটারকে আগে জানতে হবে। কথাটি অন্যভাবে বলা যায়, কোনো পণ্য বাজারে ছাড়ার জন্য আগে ফ্যাক্টরিতে নয়, যেতে হবে ক্রেতার কাছে। ক্রেতার নিকট থেকে জানতে হবে, শুনতে হবে ক্রেতা পণ্যটি কিভাবে পেতে চায়, কত দামে পেতে চায়, কী পরিমাণ পেতে চায়, কখন পেতে চায়, কোথায় পেতে চায়, পণ্য থেকে ক্রেতারা আরও কী কী সুবিধা পেতে চায়, ইত্যাদি বিষয়গুলো। ক্রেতার অভিব্যক্তি না জেনে যদি সরাসরি পণ্য প্রস্তুত করে বাজারে ছাড়া হয় তাহলে ওই পণ্য ক্রেতার সকল চাহিদা পূরণ করতে বা সুবিধা দিতে ব্যর্থ হতে পারে। বাস্তবিক অর্থে এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে অহরহ ঘটছে। এ কারণে আমাদের দেশে সফল উদ্যোক্তার সংখ্যা যেমন কম, তেমনি কম সফল ব্যবসায়ীর সংখ্যা। আরও হতাশাজনক কথা হলো বহু বছর ধরে ব্যবসা করছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কম। কারণ, আমরা ক্রেতাদের কথা শুনি না। আমরা ভোক্তা আচরণ নিয়ে অধ্যয়ন করি না। ভোক্তা আচরণ বোঝার চেষ্টা করি না। কিন্তু বাস্তবতা হলো একজন মার্কেটার বা একটি প্রতিষ্ঠান বাজারে যদি ভালোভাবে ব্যবসা করতে চায়, মুনাফা অর্জন করতে চায়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চায়, দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসা করতে চায় তাহলে জানতেই হবে ক্রেতা বা ভোক্তার প্রয়োজন কী।
আমরা এক সময় ক্যালকুলেটর ব্যবহার করেছি শুধু যোগ-বিয়োগ করার জন্য। এরপর বাজারে সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর এলো। এটা কেন এলো, তার কারণ ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা ছিল। সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটরের যে উপযোগিতা সেটা ক্রেতারা গ্রহণ করেছে। এরপর আরও আধুনিক এবং অনেক বেশি ফাংশনাল ক্যালকুলেটর বাজারে এসেছে। এগুলোও সমানতালে বাজারে চলছে। কেন চলছে, কারণ ক্রেতাদের কাছে এই পণ্যের চাহিদা রয়েছে। একইরকম দৃশ্য আমরা দেখতে পাই মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশে নব্বই দশকের মোবাইল ফোনে শুধু কথা বলা যেত। আর আজকের দিনে যে মোবাইল ফোনগুলো বাজারে পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো দিয়ে কী করা যাচ্ছে না। কথা বলা, ছবি তোলা, মেইল পাঠানো, কোথাও যাওয়ার জন্য ম্যাপ ব্যবহার করা, কেনাকাটা করা, লেনদেন করা, বিল পরিশোধ করা, ব্লাড প্রেসার মাপা, গেম খেলা, ভিডিও করা, গান শোনা, ছবি দেখা, সহ আরও বহুবিধ কাজ এই একটি মাত্র পণ্য দিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে। মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো ক্রেতার মনের ভেতর আর কী কী প্রত্যাশা রয়েছে তা নিয়ে দিনরাত গবেষণা করছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ফিচারস যুক্ত করে নতুন নতুন মডেল বাজারে ছাড়ছে। যে কোম্পানি যত ভালো সেট বাজারে ছাড়ছে ওই কোম্পানি ব্যবসায়ে তত বেশি এগিয়ে যাচ্ছে।
একজন মার্কেটারকে খুব নিখুঁতভাবে ভোক্তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ ভোক্তার আচরণ খুব বেশি পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তন বিভিন্ন কারণে হতে পারে। ভোক্তার বয়স, আয়, শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা, সামাজিক মর্যাদা, পেশা, সংস্কৃতির প্রভাব, বাজারের আচরণ, প্রতিযোগিদের প্রচার কৌশল, রেফারেন্স গ্রুপ এর প্রভাব সহ আরও নানা কারণে ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। একজন ভোক্তা আজ যে পণ্য পেয়ে তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে ওই একই ভোক্তা ইতোমধ্যে উল্লেখিত বিষয়গুলোর কোনোটির মধ্যে অল্প পরিমাণে পরিবর্তন হলেই ওই পণ্য বাদ দিতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করছে না। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়–য়া কোনো কোনো শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটের কারণে বাটন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। পরবর্তীতে শিক্ষাজীবন শেষ করে তাঁদের মধ্যে কেউ ভালো চাকরি পেলে স্মার্ট ফোন কিনতে বিলম্ব করছে না। অথচ এক সময় ওই বাটন ফোনটাই তাঁর কাছে খুব পছন্দের ছিল।
মানুষের সহজাত একটি মনোভাব হচ্ছে পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে আচরণ খুব দ্রুত পরিবর্তন করে। কোনো ব্র্যান্ডের প্রতি খুব বেশি আনুগত্য প্রকাশ না করলে ব্র্যান্ড পরিবর্তন করা খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য এবং ফ্যাশন পণ্যের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। একজন মার্কেটার যদি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণে ধারণা না রাখে তাহলে ক্রেতা বা ভোক্তারা কখন কোনদিকে ছুটে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারবে না। অর্থাৎ ক্রেতার চাহিদার সাথে নিজেকে মেলাতে পারবে না। আর তখনই প্রতিষ্ঠানের জন্য সমস্যা তৈরি হয়। কারণ, দিনশেষে একটি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে পণ্য বিক্রির মধ্য দিয়ে। যে প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রি হবে না সেই প্রতিষ্ঠান বাজারে থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেন পণ্য বিক্রি হচ্ছে না এটা নিয়ে আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি না। পণ্য বিক্রি না হওয়ার মূল কারণ মার্কেটার বাজারে যে পণ্য ছেড়েছে ওই পণ্য ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। আর এই না পারার কারণ হলো মার্কেটার ক্রেতা বা ভোক্তাদের আচরণ নিয়ে কখনো চিন্তা করেনি।
দিনশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে যে পণ্য ক্রেতা বা ভোক্তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারে না সেই পণ্য ক্রেতা বা ভোক্তারা কেনে না। পক্ষান্তরে যে পণ্য ক্রেতাদের প্রত্যাশিত চাহিদাগুলো অতিক্রম করে যায় ওই পণ্যগুলোই শেষ পর্যন্ত ক্রেতারা কিনে নেয়। কারণ ক্রেতাদের কাছে পণ্য হলো একগুচ্ছ সন্তুষ্টির সমাহার।
(চলবে)
ভাইস চ্যান্সেলর, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক চেয়ারম্যান মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়